এনজিও কিস্তি আদায় দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা কতোটা যুক্তিযুক্ত

এনজিও সম্পর্কে যাদের ভ্রান্ত ধারনা তারা  নিচের কথাগুলো মিলিয়ে নিন।

এনজিও  হচ্ছে বাপের বড় ছেলে, সারা বছর সংসারের হাল ধরেও অবহেলিত এক বট বৃক্ষ। কথাটি কেন বলা হলো তা একটু পরে জানতে পারবেন।

যদিও অনেক আগে শোনা যেত, মারা গেলেও এনজিও নাকি কিস্তি ছাড়ে না কিন্তু এখন  মৃত্যু তো দুরের কথা , বাড়িতে গরুর বাছুর হলে কিংবা বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেলেও সেদিন ঐ বাড়ির সকলে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেয়।

এনজিও দেশের জনগণের যা যা উপকার করে থাকেঃ

  • প্রথমেই বলা প্রয়োজন বর্তমানে দেশে করোনা পরিস্থিতিতে একমাত্র এনজিও-ই সর্বপ্রথম লকডাউন মেনে সকল কার্যক্রম বন্ধ করে কোটি কোটি টাকা সহায়তা করছে।
  • দেশের যে সকল জনগণ ব্যাংক ঋণ সুবিধা হতে বঞ্চিত তাদেরকে বিনা সুপারিশে, বিনা জামানতে ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। বরং যারা ব্যাংক সুবিধা গ্রহন করে তাদের মধ্যেও ৯০% লোক এনজিও হতে ঋণ সুবিধা গ্রহন করে থাকে।
  • নিমধ্যবিত্ত এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের যখন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া খরচ, চিকিৎসা কিংবা চাষাবাদের জন্য সার ও কীটনাশক কেনার জন্য হঠাৎ টাকার প্রযোজন হয়, এলাকার কারও নিকট ধার কিংবা সহযোগীতা পান না , তখন এনজিও রা-ই আপনার নিকট একমাত্র ভরসা হয়ে দাড়ায়।
  • একমাত্র এনজিও কর্মী রা-ই রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে আপনার আমানত সংগ্রহ করে সঠিক ভাবে সংরক্ষন করে, যা আপনার দুর্দিনে কাজে লাগে।
  • এনজিও তে সঞ্চয় জমা করলে তা বৃদ্ধি পায় পক্ষান্তরে ব্যাংকে তা কমে যায়।
  • এনজিও হতে ঋণ গ্রহনে কোন প্রকার ঘুষ, দলীয় সুপারিশ লাগে না।
  • এনজিও তে ঋণবীমা সুবিধা আছে বিধায় ঋণী ব্যক্তি নিজে কিংবা তার  স্বামী/ স্ত্রী  মারা গেলে অবশিষ্ঠ ঋণ মওকুফ হয় পক্ষান্তরে ব্যাংকে ঋণী ব্যক্তি মারা গেলে কোন প্রকার ঋণ মওকুফ হয় না।
  • এনজিও তে ঋণ খেলাপী করলে সকল স্তরের কর্মী এবং কর্মকর্তা গণ সরাসরি যোগাযোগ করে সুসম্পর্কের মাধ্যমে তা আদায় করে পুনরায় ঋণ সুবিধা প্রদান করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে যে সকল খেলাপী  সদস্য আর্থিক  স্বচ্ছলতা থাকা সত্তেও  ইচ্ছাকৃত ঋণ পরিশোধ না করে এনজিও কর্মীদের নানা ভাবে অপমান এবং লাঞ্চিত করে শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধে আইনের সহায়তা নিয়ে আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
  • এনজিও তে খেলাপী টাকা দীর্ঘদিন আদায় না হলেও তাতে কোন অতিরিক্ত সুদ যোগ করা হয় না পক্ষান্তরে ব্যাংকে খেলাপীর টাকা ৫ বছরে ৫গুন বৃদ্ধি পায়।
  • একজন দোকান ব্যবসায়ী যখন পাওনাদারের অত্যাচারে দোকান খুলতে পারে না কিংবা বাকী  বিক্রি করতে করতে পুজিঁ হারিয়ে দোকান বন্ধের উপক্রম তখন একমাত্র এনজিও তাদের পাশে দাড়ায় ।
  • একমাত্র এনজিও কর্মীরাই দক্ষ, সৎ এবং নিষ্ঠার সহিত গরীব মানুষদের মাঝে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে।
  • বিভিন্ন সেবা মুলক কাজ যেমন, চিকিৎসা সচেনতা, স্যানিটেশন, নারী উদ্দোক্তা তৈরী এবং উদ্ভাবন, অকালে ঝড়ে পরা প্রাথমিক শিশুদের শিক্ষা পাঠদান, শিক্ষা বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি, অনেক সেবা প্রদান করে দেশের উন্নয়নের পক্ষে এনজিও যথাযথ  ভূমিকা পালক করে থাকে।
  • একমাত্র এনজিও কর্মীরাই সু-কাঠামোগত নিয়ম সৃঙ্খলার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করে বিধায় তারা এলাকায় কোন অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায় না।
  • অনেক এনজিও কর্মী বিদেশে অবস্থান করায় দেশে রেমিটেন্সের হার বৃদ্ধিতে এনজিও যথেষ্ট  ভূমিকা রাখছে।
  • এনজিও’র ঋণ উদ্ধৃত্ব টাকা ব্যাংক তারল্য ধরে রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে কেননা, ব্যাংকের নিজস্ব টাকা তো সব রাঘব বোয়ালদের কাছে।

এনজিও উপরোক্ত সুবিধা সমুহ জনগণের মাঝে দীর্ঘদিন থেকে যথাযথ সুনামের সহিত প্রদান করে আসছে বিধায়, দেশের কৃষিজীবি ৯০%, শ্রমজীবি ৯২%, শ্রমিক ৮৫%, বেসরকারী /সরকারী  চাকুরীজীবি ৭৫%, ক্ষুদ্র ও মাঝারী  ব্যবসায়ী  ৯০%, মৎসজীবি ৯৫%, গার্মেন্টস শ্রমিক ৯০% এনজিও হতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ঋণ সুবিধা গ্রহন করে থাকে।

করোনা সংক্রান্তী পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন এনজিও কিস্তি আদায় বন্ধ রাখা কতোটা যুক্তিযুক্ত তা কেউ না ভেবেই চেচামেচি শুরু করে দিচ্ছি।

টাকা ছাড়া মানুষ অচল। দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থাকার পর, দেশের সকল স্তরের মানুষের আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় হবে যে, একমাত্র যারা এনজিও-তে কাজ করে তারাই উপলব্ধি করতে পারে। সরকারের পাশাপাশি সকল দাতা সংস্থাগুলো মানুষকে অনেক কিছু দিবে কিন্তু কেউ টাকা দিবে না।এই সময় যদি এনজিও বন্ধ থাকে , টাকার জন্য জনগণ মহাজনী ঋনের দিকে ঝুকে পড়বে। মহাজনরা তো তখন চড়া সুদে জনগণকে জিম্মি করে ফেলবে, তাছাড়া মহাজনীরা সবাইকে তো টাকা দিতেই পারবে না। এলাকায় তখন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এতোটাই বৃদ্ধি পাবে আপনি কল্পনাই করতে পারবেন না।

তাই উক্ত সময়ে কিংবা দীর্ঘদিন এনজিও বন্ধ না রেখে কিছু নিয়ম নীতি শিথিল রেখে, ঋণের ধরন, সুদে হার শিথিলকরন, সম্পূরক ঋণ প্রদান ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহন করে এনজিও কিস্তি আদায় চালু রাখলে সকল স্তরের মানুষ  স্বস্তি পেতে পারে।

বর্তমানে করোনা মোকাবেলায় করনীয় সুপারিশ

আজ বিস্বজুড়ে করোনা পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর । বিস্বের সকল ক্ষমতাবান দেশ সমূহ দ্বিধাদ্বন্ধ উপেক্ষা করে এক অপরের সহযোগীয়তায় নেমে পড়েছে। আমাদের দেশও আজ কঠিন অবস্থায় অতিক্রম করছে। সবাই কাজকর্ম , অফিস আদালত, স্কুল, কলেজ বন্ধ রেখে নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করছে। কাজকর্ম করছে না বিধায় দেশের দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, শ্রমিক সহ সকল প্রকার শ্রমজীবি মানুষ অতি কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছে।

এমতাবস্থায় নিম্নলিখিত সুপারিশ সমূহ গ্রহন করে দেশ ও জাতীর উন্নয়নে সকল স্তরের অংশগ্রহন নিশ্চিত করলে করোনা মোকাবেলা করা যেতে পারে।

  • কিছুদিন আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখা যেত , সরকার কর্তৃক দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের অলস টাকা সরকারী কোষাগারে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছিল- সে সকল প্রতিষ্ঠানের কিছু টাকা গরীব, অসহায় লোকদের মাঝে ত্রান হিসেবে বিতরনের ব্যবস্থা করা।
  • দেশের বীমা কোম্পানী গুলো কে এগিয়ে আসা । জনগণকে তাদের টাকার কিছুটা বোনাস হিসেবে প্রদান করা ।
  • আশা/ ব্র্যাকের মতো দেশের সকল এনজিও কে এগিয়ে আসা।
  • দেশের মোবাইল কোম্পানী গুলো কে শুধুমাত্র প্রলোভন বিজ্ঞাপন না দিয়ে জনগণের পাশে দাড়ানোর বাধ্যবাধকতা করা।
  • সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা। আপনারা সবাই ভালকরে জানেন আপনার পাশের লোকটি কি করতো ? সে আজ ছেলেমেয়েদের  নিয়ে কত কষ্টে আছে ? তাই আপনার সাধ্য মতো যতটুকু পারেন, ততোটুকু দিয়েই তাদের পাশে দাড়ান।
  • যে সকল চাকুরীজীবিগণ বাসায় বসে থেকেও বেতন পাচ্ছেন , তারা কর্মস্থলে কাজ করার সময় যে টাকা যাতায়াত বাবদ খরচ হতো তার কিছু অংশ অসহায়দের মাঝে বিতরন করা ।

ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *